কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জের দিগন্তজোড়া হাওরজুড়ে সোনালী ধানের পরিবর্তে এখন শুধু অকাল বন্যা আর অতিবৃষ্টির পানির থৈ থৈ গর্জন। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে বাতাসের দোলায় দুলছিল কৃষকের ঘামঝরানো সোনালি বোরো ধান, আজ সেখানে কেবলই কৃষকের চোখের পানি আর বুকফাটা আর্তনাদ। বন্যার পানি আর কৃষকের চোখের পানিতে একাকার হাওরের ধানিজমি।
চলতি এপ্রিল মাসের ২৫ তারিখ থেকে অবিরাম বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। কৃষকের বুক ভরা স্বপ্ন এখন পানির নিচে পচে মরছে, আর তাদের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার নোনা জল।
হাওরের মানুষের কাছে বোরো ধানই একমাত্র ফসল, যা দিয়ে তাদের সারা বছরের খোরাকি আর জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো হয়। বৈশাখের এই সময়ে কৃষকের ঘরে ধান ওঠার কথা ছিল, উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল প্রতিটি আঙিনায়। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলায় মুহূর্তেই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট।
ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার ধান প্রায় পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক আধাপাকা ধানই কেটে ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাতে লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না।
বন্যার কারণে ধান কাটার শ্রমিকের মজুরিও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ, যা দিশেহারা কৃষকের ওপর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে ধান কেটে সংগ্রহ করলেও অতিবিষ্টির কারনে শুকনো যাচ্ছে না। ফলে ভিজা ধানেই ছাড়া ঝালিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দিগুণ হচ্ছে।
ইটনা উপজেলার এক প্রান্তিক কৃষক সিরাজ মিয়া ছলছল চোখে বলছিলেন,“অপরের জমি বন্দক রাইখা বীজ-সার দিছিলাম। আশা আছিল ধান বেইচ্যা ঋণ শোধ করবাম। অহন সব তো পানির নিচে। আল্লাহ্ ছাড়া আমরারে আর দেখার কেউ নাই।” এই হাহাকার এখন ঘরে ঘরে। যে হাওর ছিল সমৃদ্ধির প্রতীক, সেই হাওরই এখন বিষাদের সিন্ধু। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট আর পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকের কপালে পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাজ।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করা হলেও মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বাঁধ রক্ষা বা আগাম সতর্ক বার্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ থাকলেও, আপাতত কৃষকের একমাত্র চাওয়া-সরকারি সহায়তা ও কৃষি ঋণের কিস্তি স্থগিত করা।
বৈশাখের যে রোদ সোনালি ধানকে ঝলমলে করার কথা ছিল, সেই বৈশাখই আজ কিশোরগঞ্জের মানুষের জন্য বয়ে এনেছে এক দীর্ঘশ্বাস। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের এই কান্না থামানোর সাধ্য হয়তো প্রকৃতিরই আছে, নতুবা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পাড়ি দিতে হবে এক চরম খাদ্য সংকটের দিকে।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড.মোঃ সাদিকুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত হাওরের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৪ উপজেলা ইটনা মিঠামইন অষ্টগ্রাম ও নিকলী এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ৪ টি উপজেলা তাড়াইল, করিমগঞ্জ, বাজিতপুর, ভৈরবসহ মোট ৮ টি উপজেলার মোট ৪৭৫৪ হেক্টর ধানিজমি বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান। তিনি আরও জানান, এখনো আমরা হাওরে আছি সঠিক ক্ষতির পরিমাণ কিছু বাড়তে পারে।
বিষয়টি নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা- মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের স্থানীয় সাংসদ বর্শিয়ান রাজনীতিক বীরমুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদে হাওরবাসীর আগাম বন্যা তথা প্রাকৃতিক দূর্যোগের বিষয়টি নিয়ে কথা বলে হাওরবাসীর এই সংকট উত্তোরনের দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিনমাস সরকারি সহযোগিতার ঘোষণা আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে।