নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে লোকজ সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য পালাকার ও লোকসংগীত শিল্পী ইসলাম উদ্দিন পালাকারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার (২৯ মার্চ) বিকেলে জেলা পাবলিক লাইব্রেরি হলরুমে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, কিশোরগঞ্জ জেলা ইউনিটের আয়োজনে এবং ভোরের আলো সাহিত্য আসরের সহযোগিতায় আয়োজিত অনু্ষ্ঠানে সংবর্ধিত এই গুনীশিল্পীকে ক্রেস্ট ও ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।
এসময় ব্র্যাক মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত সাংবাদিক রেজাউল হাবিব রেজার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, কিশোরগঞ্জ জেলা ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল হক সাদীর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির জেলা সভাপতি সাংবাদিক শফিক কবীর।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক ফারুকুজ্জামানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সংবর্ধিত শিল্পী ইসলাম উদ্দিন পালাকার, জেলা পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মু. আ. লতিফ, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী আবুল হাসেম, বিআরডিবির সাবেক পরিচালক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট নিজাম উদ্দিন, নিরাপদ সড়ক চাই জেলা শাখার সভাপতি ফিরোজ উদ্দিন ভূইয়া, ভোরের আলো সাহিত্য আসরের সভাপতি মোতাহার হোসেন, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কিশোরগঞ্জ জেলা ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মাওঃ এমদাদুল ইসলাম, সাংবাদিক হাবিবুর রহমান বিপ্লব এবং নাট্যকার আতাউর রহমান মিলনসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, ইসলাম উদ্দিনের কণ্ঠে শুধু সুর নয়, আছে গ্রামের ইতিহাস। মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম আর বেদনার গল্প। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি পালাগানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন এই ঐতিহ্য। একুশে পদক তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ২০২৬ সালে ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদকে ভূষিত করেছে। নাট্যকলা বিভাগে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক এ সম্মাননা লাভ করেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে তিনি এ পদক গ্রহণ করেন।
স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে করিমগঞ্জের নোয়াবাদ গ্রামে বসবাস করেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। বড় দুই ভাই যাত্রাদলে অভিনয় করতেন সেখান থেকেই ছোটবেলায় তাঁর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মঞ্চে ওঠেন তিনি। পরবর্তীতে হাওর অঞ্চলের খ্যাতিমান লোকসংগীতশিল্পী কুদ্দুস বয়াতির নজরে পড়েন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ওস্তাদের বাড়িতে থেকে কঠোর সাধনার মাধ্যমে কিচ্ছাগান রপ্ত করেন।
১৯৮৯ সালে নিজের পালাগানের দল গঠন করে গ্রাম থেকে গ্রাম, জেলা থেকে জেলায় ঘুরে পরিবেশন করতে থাকেন পালাগান। এর মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পালাগানই হয়ে ওঠে তাঁর পেশা ও ভালোবাসা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও তিনি বাংলা লোকসংস্কৃতির সুনাম ছড়িয়েছেন। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ফ্রান্স ও ভারতেও পরিবেশন করেছেন পালাগান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর কণ্ঠে গাওয়া দেওড়া গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া তাঁর পরিবেশিত উল্লেখযোগ্য পালাগানের মধ্যে রয়েছে, কমলা রাণীর সাগর দিঘি, জাহাঙ্গীর বাদলা, মতিলাল, রূপকুমার, উথুলা সুন্দরী, কাকাধরের খেলা, আমির সাধু, সুন্দর মতি, রাম বিরাম ও ফিরোজ খাঁ।
একুশে পদক প্রাপ্তিতে সরকার ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইসলাম উদ্দিন বলেন, একেকটি পালাগান চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার হয়ে থাকে। এতে অনেক চরিত্র থাকে, সব চরিত্র আমাকেই একা গাইতে হয়। নেচে-গেয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে এই গান পরিবেশন করা হয় পরিশ্রম অনেক। পালাগান আমার কাছে বহু কষ্টের ধন। আমি চাই এই পালাগান যেন বিলুপ্ত না হয়। আমি না থাকলেও যেন এই ঐতিহ্য টিকে থাকে। তিনি আরও বলেন, এই সম্মান শুধু আমার নয়, কিশোরগঞ্জের সকল মানুষের।